Home / জাতীয় / নির্বাচনে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইসির অধীনে চান মাহবুব তালুকদার

নির্বাচনে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইসির অধীনে চান মাহবুব তালুকদার

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে রাক্ষার পক্ষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। একইসঙ্গে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের স্বার্থে সেনা মোতায়েন ও সরকারের সঙ্গে সংলাপও চান তিনি। সোমবারের (১৫ অক্টোবর) কমিশন সভায় তার এই প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু লিখিত সুপারিশ-প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন এই কমিশনার। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য তিন কমিশনারের আপত্তির মুখে তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেননি। এই কারণে বাক-স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে বৈঠক বর্জন করেন মাহবুব তালুকদার। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং করে বৈঠক বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তার বক্তব্যের একটি লিখিত কপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। এতে তিনি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সেনা মোতায়েন, সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

 

সংলাপের সুপারিশে অংশীজনদের অনেকে নির্বাচনকালে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি ইসির অধীনে ন্যস্ত করার কথা বলেছেন উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার তার প্রস্তাবে বলেছেন, ‘বিষয়টি বিতর্কমূলক হলেও বিবেচনাযোগ্য। ইসির কাছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকলে জাতীয় নির্বাচনে জনগণের আস্থা বাড়বে। একইসঙ্গে অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে তা সহায়ক হবে।’

 

সংলাপে অধিকাংশ দল ইসির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিল উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার তার প্রস্তাবে বলেছেন, আইনগতভাবে ইসির যথেষ্ট ক্ষমতা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছানুযায়ী কমিশন তা প্রয়োগ করতে পারে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাগজপত্রে ইসির অধীনে ন্যস্ত হলেও বাস্তবে কমিশন তাদের ওপর খুব একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না।

 

মাহবুব তালুকদার তার প্রস্তাবে আরও বলেন, ‘নির্বাচনে নিরপেক্ষতা অর্জন শুধু ইসির বিষয় নয়। এটি সরকারের ভূমিকার ওপরও নির্ভর করে। সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর হলেই কেবল ইসি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল যে সুবিধা ভোগ করছে, বিরোধী দল সংবিধানে দেওয়া অধিকার তুলনামূলকভাবে তেমন ভোগ করতে পারছে না। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের কমিটি ধরে ধরে মামলা দায়ের বা গায়েবি মামলা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তফসিল ঘোষণার আগে ইসির কার্যকরভাবে কিছু করার সুযোগ না থাকলেও সব পক্ষের প্রতি সম-আচরণের স্বার্থে ইসি বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।

 

প্রস্তাবনায় এই কমিশনার বলেন, এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে ইসি উদ্যোগ নিতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে নির্বাচনে অনিয়মের পথ বন্ধ হয়। এজন্য আবারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। এতে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে না পারলেও নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখা যাবে সংবিধানে এ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সংবিধানের স্পিরিট হচ্ছে, গণতন্ত্রের জন্য অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। ইসি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসলে অনেক কঠিন সমস্যারও সমাধান হতে পারে।

 

সেনা মোতায়েন বিষয়ে প্রস্তাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে বাদ দেওয়ায় এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী নির্বাচনে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, তাদের কার্যপরিধি আগেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।’

 

সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব করে এই কমিশনার প্রস্তাবে বলেন, সংলাপে আসা কিছু সুপারিশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলে দেখা গেছে। এর মধ্যে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও সুপারিশ রয়েছে যা সরকারি সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য মনে হলে তফসিল ঘোষণার আগেই ইসির উচিত সরকারের সঙ্গে সংলাপ করা। জনমনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের আস্থা তৈরি করতে সরকার ও ইসির একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

 

সংসদ বহাল থাকলে সংসদ সদস্যদের নিষ্ক্রিয় রাখার ঘোষণা দিলেই  লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি সম্ভব কিনা, সেই প্রশ্ন রেখেছেন এই কমিশনার। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কমিশন একার পক্ষে সংসদ সদস্যকে নিষ্ক্রিয় রেখে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।বৈঠক বর্জন নিয়ে যা বললেন

 

কমিশন সভায় কথা বলতে চেয়েও তা না পেরে অপমানিত হয়ে বৈঠক বর্জন করেছেন বলে মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। সভা বর্জন  ও নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করেছিল। কিন্তু ওই সংলাপের সুপারিশ বা প্রস্তাব সম্পর্কে এখনপর্যন্ত কমিশনের কোনও সভায় আলোচনা হয়নি। সংলাপের কোনও কার্যকারিতা না দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি বিষয়টি পর্যালোচনা করে কমিশনের সভায় উপস্থাপন করতে চেয়েছি। যা আমি কমিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছি। তবে আমি যা আলোচনা করতে চেয়েছিলাম কমিশন সভায়, আমাকে তা উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। অথচ বিগত ৮ অক্টোবর কমিশন সচিবালয় থেকে ইউ নোটের মাধ্যমে আমাকে আজকের (সোমবারের) সভায় উপস্থাপনার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে বলে আবার সেটা না দেওয়ায় আমি অপমানিতবোধ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা ও ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান প্রদত্ত আমার মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার এই অধিকার খর্ব করতে পারে না। এমতাবস্থায় নিরুপায় হয়ে আমি কমিশনের এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। প্রতিবাদ হিসেবে সভাও বর্জন করেছি।’

 

যা বলছেন ইসি সচিব

 

কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সংবাদ সম্মেলনের আগে তার সভা বর্জন নিয়ে কথা বলেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘তিনি (মাহবুব তালুকদার) তার একটি বিষয় এজেন্ডাভুক্ত করার জন্য কমিশনে অনুরোধ করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য তিন কমিশনার মনে করেছেন, তার এই বিষয়টুকু এজেন্ডভুক্ত নয়। তাই এই সভায় আলোচনারও কোনও কারণ নেই। এজেন্ডাভুক্ত হয়নি বলে তিনি সভা ত্যাগ করে চলে গেছেন।’

 

এই ধরনের সভা বর্জন কমিশনে অনৈক্য প্রদর্শন করে কিনা, জনতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘বিষয়টি কমিশনের। কমিশন যেভাবে মনে করেছে,  সেভাবেই মত দিয়েছে।’ সচিবালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে তিনি এ বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে চান না। তবে, আশা করছেন সব কমিশনার বৈঠকে অংশ নেবেন, তাদের মত দেবেন।

 

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের সুপারিশ থেকে ইসির এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও ইসি সচিব এ সময় দাবি করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *