Home / সম্পাদকীয় / বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন

বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন

সব বৈদেশিক উৎস থেকে যে বাংলাদেশ ঋণ পাবে এমন নয়। তবে কোন কোন উৎস বাংলাদেশের কাছে ঋণ বেচতে অতি আগ্রহী হতে পারে? সরকারের জন্য বিদেশ থেকে ঋণের উৎস তিনটি।

 

 

এক. সরকার চাইলে ডলার ডমিনেটেড বন্ড ইস্যু করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুদ দিতে হবে বেশি। বাংলাদেশ সোভারেন বন্ড ইস্যু করে আমার জানা মতে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অর্থবাজার থেকে কোনো ঋণ নেয়নি। দুই. বাংলাদেশ চাইলে বিদেশি কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে সুদ দিতে হবে বেশি। কত সুদ দিতে হবে তা নির্ভর করে ক্রেডিট রেটিংয়ের (Credit Rating) ওপর। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট এজেন্সিগুলো বাংলাদেশকে এখনো A+ গ্রেড দেয়নি। সুতরাং বাংলাদেশকে উপযুক্ত গ্যারান্টি দিয়েই শুধু ঋণ নিতে হবে। এবং সুদ তো অবশ্যই বেশি হবে।

 

 

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঋণ নিয়েছে বটে, তবে অবাধভাবে ব্যবহার করার জন্য। বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইনসের জন্য বোয়িং বিমান কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের গ্যারান্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের Exim ব্যাংক এ ধরনের সীমিত ঋণ দিয়েছে। অন্য উৎস হলো, বৈদেশিক সরকারি উৎস বা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ এ ধরনের বৈদেশিক ঋণ অনেক নিয়েছে।

সাধারণত সরকার থেকে সরকারে যে ঋণ বাংলাদেশ সরকার পায়, সে ঋণের সুদ ও অন্য শর্তাবলি আমাদের পক্ষে থাকে। ঋণের ভার কম থাকে। তবে এ ধরনের ঋণের সীমাবদ্ধতা হলো, চাইলেই এই ঋণ বেশি পাওয়া যায় না। এ ধরনের ঋণ আসে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের বিপরীতে। এ ধরনের FYGK ODA (Official Development Assistance) বলে। অন্য আরেকটি সূত্র থেকেও বাংলাদেশ সরকার এবং ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের ব্যক্তি খাত ঋণ পায়। সেটা হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো যেগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক (The World Bank) IMF, ADB, IDB (Islamic Development Bank) এবং হালে প্রতিষ্ঠিত AIIB (Asian Infrastructure and Investment Bank)| তবে এসব সংস্থা থেকেও বাংলাদেশ যত চাইবে তত ঋণ পাবে না। এরা যে অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে বা যে অর্থ এরা কনসেশনারি ঋণ হিসেবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রদান করে, সে অর্থের আকার অত বড় নয়। বাংলাদেশ প্রতিবছর এসব উৎস থেকে দুই-তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিচ্ছে এবং এই ঋণ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আগ্রহ বেশি। কারণ হলো এসব ঋণের ভার (Burden) কম। বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্যিক শাখা IFC (International Finance Corporation) গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতে বেশ ভালো ঋণ দিচ্ছে। এরই মধ্যে যেসব ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান IFC থেকে ঋণ নিয়েছে তার মধ্যে City Bank, Green Delta বীমা কম্পানি অন্যতম। এই সংস্থা শুধু যে ঋণ বেচে তা-ই নয়। এরা সম মূলধন বা Egnity ক্যাপিটালেও অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা এখনো বড় হয়নি সত্য, তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই বাস্কেটের (Basket) আয়তন দিন দিন বাড়ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের কিছু ব্যক্তি খাত (Private Sector) বৈদেশিক উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত মেনে।বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে কী কাজে এই খাতের ব্যাংকগুলো ব্যয় করছে, তার তদারকি অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংককে করতে হবে। ব্যক্তি খাতের কম্পানিগুলো যদি ঋণকে সফলভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ওই ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে। বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ সেটা চাই ব্যক্তি খাত নিক বা সরকার নিক—শোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়ই। বাংলাদেশের অবস্থা যদি অমন হয় যে শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রায় সে ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন কেমন হবে? বিশ্বে কয়েকটি অর্থনীতি বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ করে পরে শোধ দিতে পারেনি। তখন আন্তর্জাতিক মহল ওই সব দেশের জন্য আর্থিক পুনর্গঠন কর্মসূচি বা Bailout প্রগ্রাম ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকটা বিচ্ছিন্ন একটা অর্থনীতি। আমাদের রপ্তানি আয় খুব দ্রুতগতিতে বাড়বে এমন আশা বর্তমান অবস্থায় করা ঠিক হবে না। ঋণ শোধ করার সক্ষমতা তখনই হবে যখন দ্রুতগতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়তে থাকবে। রপ্তানি বাড়াতে হলে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এক. বাংলাদেশকে রপ্তানি পণ্য ও সেবা দিয়ে অন্যদের বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার পেতে হবে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের নেই। দুই. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় উল্লম্ফন ঘটাতে হবে, যেটা এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতেই বিনিয়োগের উল্লম্ফন ঘটে না।

 

বিনিয়োগ ও রপ্তানি এই দুটি একসঙ্গে হতে হবে। আমাদের উদ্যোক্তা এবং বিদেশি ব্যবসায়ীরা যদি দেখে যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে অন্যের বাজারে রপ্তানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করা যাবে, তাহলেই শুধু এই অর্থনীতি বড় রকমের বিনিয়োগ লাভের আশা করতে পারে। বাংলাদেশের প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে অতি ক্ষীণ। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত কোনো FTA (free-trade agreement) সই করতে পারেনি, না বাংলাদেশ হতে পেরেছে কোনো বড় অর্থনীতির সঙ্গে কৌশলগত (Strategic) পার্টনার। শুধু WTO (World Trade Organization)-এর অধীনে স্বাক্ষরকৃত ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টগুলোর ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাড়াতে পারবে না। সামনে এ ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলো আরো বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের দোষ হলো, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যা যা ভালো করেছে তা নিয়ে একধরনের আত্মতুষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশকে দেখতে হবে অন্য দেশ কী করছে। শুধু বৈদেশিক ঋণের সেবা বাড়ালে বাংলাদেশ বিপদে পড়তে পারে। আরেকটা কথা বলা ভালো, সেটা হলো ঋণ পেলেই যে ঋণ নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। প্রতিটা ঋণ নেওয়ার আগে ঋণের Cost Benefit বিশ্লেষণ করা উচিত। বিদেশিরা যদি ইকুয়িটি মূলধনের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে, সেটা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। সে ক্ষেত্রে আরো ভালো হবে তাদের ইকুয়িটি ক্যাপিটালে বাংলাদেশ সরকার একটা অংশ যদি রাখতে পারে, সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার বিদেশ থেকে কিছু বড় ঋণ নিয়েছে। আমরা জানি না ওই সব ঋণের Cost Benefit বিশ্লেষণ করা হয়েছে কি না। যে ঋণ ব্যবহার থেকে অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত উপকার পাবে না ওই সব ঋণ না নেওয়াই ভালো। আর যাদের থেকে ঋণ নিচ্ছি তাদের বলা যেতে পারে, তাদের অর্থনীতি যেন আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য খুলে দেয়। যাদের অর্থ আছে, তারা ঋণ দেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে সবটা ঋণ হিসেবে না নিয়ে তাদেরকে বলা যে তারা যেন একটা অংশ পর্যন্ত যেমন ৩০-৪০ শতাংশ সমমূলধনে বা ইকুয়িটি ক্যাপিটালে অংশ নেয়, তাহলে সেসব ঋণের ব্যবহার যেমন ভালো হবে, তেমনি ঋণদাতা সংস্থারও একটা দায় থাকবে ঋণের ভালো ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

 

আমাদের যেসব প্রকল্প বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালানো যায় বিদেশিরা ওইগুলোতে Equity বা মালিকানার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে। যেমন আমাদের এয়ারপোর্ট বিনির্মাণে, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে এমন অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো উচিত। শুধু ঋণ করে বাংলাদেশ সরকার যদি এমন প্রকল্পগুলো অর্থায়ন করে, তাহলে ঋণের পূর্ণ সেবা বাংলাদেশ সরকারের ওপরই থাকবে। অন্যথায় ওই সব ঋণ দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহারও হবে না। শেষ পর্যন্ত অনেক মেগা প্রজেক্টস (Mega Projects) বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, শুধু যদি ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। ঋণ বিক্রেতা অনেক হতে পারে। কিন্তু Equity-তে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার অনেককে না-ও পেতে পারে। কেন আমরা গবমধ Projects-গুলোকে কম্পানি করে দেশের শেয়ারবাজারে Equity অর্থায়নের জন্য বেচতে পারছি না? এ ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞানের অভাব আছে। আশা করি, সামনে জনগণের অংশগ্রহণের প্রভিশন রেখে মেগা প্রজেক্টস গ্রহণ করা হবে।

 

 

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়(সুত্রে পাওয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *