স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, মোট অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সংসদে ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন বিএনপির পক্ষ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সাইফুর রহমান।

 

 

আবুল মাল আবদুল মুহিতও ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেছেন।

৪৭টি বাজেটের মধ্যে ৩০টি বাজেট প্রণয়ন করেছেন সিলেটে জন্মগ্রহণকারী অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, এস এ এম এস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১১ জন বাজেট প্রণেতার মধ্যে রাজনীতিবিদ একজন, অর্থনীতিবিদ চারজন, সামরিক কর্মকর্তা দুজন, আমলা তিনজন এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট একজন।

 

সাইফুর রহমানের ১৯৮০-৮১ সালে প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল চার হাজার ১০৮ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে দ্বাদশ বাজেটের পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এ এম এ মুহিতের ১৯৮২ সালের প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা এবং ২০১৮ সালে খসড়া দ্বাদশ বাজেটের পরিমাণ হচ্ছে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা অর্থাৎ আবুল মাল আবদুল মুহিতের নিজের প্রথম বাজেটের চেয়ে দ্বাদশ বাজেট প্রায় ৯৮ গুণ বড় এবং তাজউদ্দীন আহমদের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম বাজেটের তুলনায় ৫৯২ গুণ বেশি। অগ্রগতি তো বটে। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ণয়ের জন্য বিবেচনা প্রয়োজন মানবিক সূচকের অগ্রগতির বিষয়গুলোও।

 

৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে’ সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ শিরোনামে ১৫৬ পৃষ্ঠার বাজেট উপস্থাপন করেছেন সংসদে, যে সংসদের প্রায় ৭০ শতাংশ সংসদ সদস্য সরাসরি ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। সংসদের কার্যকলাপের চেয়ে তাঁরা নিজস্ব পেশা ও ব্যবসায় বেশি পরিতুষ্ট।

 

 

‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাবে সংসদে কোরাম সংকটে দেশের ক্ষতি হয়েছে গত বছর ১২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ সালের বাজেট ঘাটতির পুরো ১০ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপমন্ত্রী উভয়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের সাবেক সদস্য (সিএসপি)। তাঁদের প্রশিক্ষণ ও পারদর্শিতা কেন্দ্রিকতার রক্ষা, বিন্যাস ও বিকাশে।   তাঁরা স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির দক্ষতায় বিশ্বাসী নন এবং তাঁদের প্রশিক্ষণেও আগ্রহী নন, যা প্রতিভাত হয়েছে বাজেটের প্রায় ছত্রে এবং সংবিধানের স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ১১, ৫৯ ও ৬০-এর প্রতি অবজ্ঞায়।সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর ৩৫.২ শতাংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বাবদ। এটাই আমলাদের চালাকি ও বাহাদুরি, ছলচাতুরীতে তাঁরা অতুলনীয়। কোটারি স্বার্থ সংরক্ষণই তাঁদের শিক্ষা। নিজেদের ভবিষ্যৎ সংরক্ষণের নিমিত্তে বেশির ভাগ আমলা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সহযোগিতা করতে অতীব আগ্রহী।

 

 

 

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধ, পিপিপি ভর্তুকি ও দায় এবং নিট ঋণদানের জন্য মোট ৭৬ হাজার ৩০ কোটি টাকা (১৬.৩৭ শতাংশ)। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ পেয়েছে ২৯ হাজার ১০২ কোটি (৬.৬৭ শতাংশ) এবং জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিভাগকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা (৫.৭২ শতাংশ)। সমৃদ্ধ আগামীর পদযাত্রায় বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাস্তবায়ন পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং কম্পট্রোলার ও অডিট বিভাগের কার্য পরিচালনার জন্য। বরাদ্দ প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রপতি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুত্ব ও জবাবদিহির প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধ। দেশে দুর্নীতির বিস্তার নির্ণয়ের জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। বিনা টেন্ডারে অধিক হারে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, শিক্ষক, পুলিশ কনস্টেবল ও মিডওয়াইফ পদে চাকরির জন্য ন্যূনতম আট লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা  ঘুষের কথা সর্বজনবিদিত।

 

মাদকাসক্তি থেকে তরুণসমাজকে নিবৃত্ত করতে হাই স্কুল ও কলেজে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় খেলাধুলা এবং লোকসংস্কৃতির বিশেষত স্থানীয় গম্ভীরা, বাউল, ভাওয়াইয়া, পুতুলনাচ, পালাগান, যাত্রা, জারিগান, যোগীর গান, সারির পাঠ, মানিক পীরের গান, শোকের হারি প্রভৃতি কবিগানের আসর পরিচালনার জন্য বরাদ্দ নিদেনপক্ষে দ্বিগুণ বাড়াতে হবে। এতে ব্যাপকসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর অংশগ্রহণ সম্ভব হবে। হাই স্কুল ও কলেজের মেয়েদের জন্য বিভিন্ন প্রকার ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও আত্মরক্ষামূলক মার্শাল আর্টসের প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা বিভাগ করে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। খেলাধুলার প্রসার ও স্থানীয় পর্যায়ে লাইব্রেরির বিকাশের পরিবর্তে সরকার স্টেডিয়াম স্থাপনে অধিকতর উৎসাহী ঘুষের লেনদেনের কারণে।

 

কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ পাঁচ হাজার ৭০২ কোটি টাকা আলাদা করে দেখানো প্রয়োজন এবং মাদরাসা শিক্ষা ব্যয় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের এক হাজার ৪৯৮ কোটি টাকার সঙ্গে যোগ করে দেখানোই যুক্তিসংগত কিংবা মাদরাসা শিক্ষাকে ‘প্রাথমিক, গণশিক্ষা ও আধুনিক মাদরাসা শিক্ষা’ শীর্ষক মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত করা হবে সঠিক পদক্ষেপ।রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে সব সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্ববিদ্যালয়) দেখভাল ন্যস্ত হলে উচ্চশিক্ষা গতিশীল হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও (UGC) রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। উল্লেখ্য যে রাষ্ট্রপতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও বটে। স্মরণযোগ্য যে কার্যক্রমবিহীন অলস জীবনযাপনে রুগ্ণ হয়ে অতীতে মাননীয় রাষ্ট্রপতি কয়েকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চশিক্ষা বাবদ বরাদ্দ রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে স্থানান্তর ন্যায্য কাজ হবে।

 

বাজেটে উপেক্ষিত সুশাসন ও প্রশিক্ষণ

 

বাজেটে অর্থমন্ত্রীর সুশাসন সম্পর্কে দুই পৃষ্ঠা বক্তব্য থাকলেও সুশাসন স্থাপনের সদিচ্ছার কোনো প্রমাণ প্রস্তাবিত বাজেটে প্রকাশ পায়নি। সুশাসনের ভিত্তি হবে  সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি হ্রাসের জন্য যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ।

 

কেন্দ্রিকতা যানজট ও হয়রানি বৃদ্ধি করে এবং জনগণকে উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত করে। ঢাকা শহরের পুরনো হাসপাতালগুলো যথা—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বিএসএমএমইউ ও পঙ্গু হাসপাতালে ১০ থেকে ১৪ তলা বিল্ডিং তৈরি করলেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হবে না, তবে অগ্নিনির্বাপক বিভাগের কাজ জটিল হবে এবং কর্মচারীদের দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে। এটা ভুল পদক্ষেপ। সঠিক পদক্ষেপ হতো  প্রধানমন্ত্রীর দুটি নির্দেশের দ্রুত বাস্তবায়ন—প্রথমত, ঢাকা শহরে কর্মরত কয়েক শ চিকিৎসককে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দুই বছরের জন্য প্রেরণ এবং চার হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নবীন চিকিৎসকদের এক বছর ইন্টার্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ। সঙ্গে প্রতিবছর মেডিক্যাল ছাত্রদেরও সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। নবীন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এক বছর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং দ্বিতীয় বছর সার্বক্ষণিকভাবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে (UHFWC) অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নেবেন। এতে স্থানীয় জনসাধারণ উপকৃত হবে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ইউনিয়নের ৪০ থেকে ৬০ হাজার জনগণ ২৪ ঘণ্টা উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং শহরবাসী মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সন্তানদের পল্লীভীতি কাটবে।

 

ঢাকা শহরের ব্যাপক জনসাধারণকে অকারণে সরকারি বড় হাসপাতালে ভিড় করা ও দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করার নিমিত্তে ঢাকা শহরের ৯৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে চার-পাঁচটি জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) সেন্টারের উদ্বোধন করলে নগরবাসী উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবে। প্রতি (GP) সেন্টারে দুজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ১০ জন স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, প্যাথলজি টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিবন্ধিত পরিবারকে সেবা দেবেন। রেফার না হলে কেউ সরাসরি বড় হাসপাতালে ভিড় করতে পারবেন না। ক্লিনিক ভাড়া, ফ্রি ওষুধ ও বেতন-ভাতা বাবদ দেড় কোটি নগরবাসীর জন্য অনধিক ৪০০ কোটি টাকা বছরে ব্যয় হবে।

 

সুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে প্রথম বছর এক হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের প্রতিটিতে চারজন চিকিৎসকের বাসস্থান, ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্রের জন্য ডরমিটরি, ক্লাসরুম, লাইব্রেরির জন্য মাত্র ছয় হাজার বর্গফুটের বিল্ডিং তৈরির প্রয়োজন হবে। এতে সর্বসাকল্যে ব্যয় মাত্র এক হাজার ২০০ কোটি টাকা (১০০০ কেন্দ্রে x ৬০০০ বর্গফুট x ২০০০ টাকা) খরচ হবে।

 

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রতি ১০ গ্রাম জর্দা, গুলের মূল্য ৩০ টাকা, প্রতি ১০ শলাকা বিড়ির মূল্য ১০ টাকা এবং ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ১০০ টাকা ধার্য করে ৬৫ শতাংশ সম্পূরক কর আরোপ করা হলে শুল্কলব্ধ অর্থ দিয়ে পাঁচ হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও নগর GP  সেন্টারের সব ব্যয় বহন সহজ হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ক্ষতিকর এনার্জি ড্রিংকস ও অন্য ধরনের মদের ওপর অধিক হারে সম্পূরক শুল্ক ধার্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে চুইংগাম, সুগার কনফেকশনারি, চকোলেট কোকো ও পলিথিন প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর ৫ থেকে ১০ শতাংশ সম্পূরক কর যথেষ্ট নয়।সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের যথাযথ প্রয়োগের নিমিত্তে সারা বাংলাদেশকে ১০টি প্রদেশ বা বঙ্গবন্ধুর বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্নানুযায়ী ৬৫টি স্টেট সৃষ্টির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন ছিল। নিদেনপক্ষে অনুচ্ছেদ ৫৯ অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সৃষ্ট স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় জনগণের ভোটে নির্বাচিত জেলা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদেশে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘Elected District Health/Education/Technical Training/Social Security Authority স্থাপন একান্ত প্রয়োজন। এজাতীয় স্বয়ংশাসিত জেলা কর্তৃপক্ষ স্থাপনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। আমলা ও নগরবাসী রাজনীতিবিদরা  কেন্দ্রিকতা পছন্দ করেন, নিদেনপক্ষে কেন্দ্রের আমলা দ্বারা স্থানীয় শাসন নিয়ন্ত্রণ।

 

বিশ্বস্বাস্থ্য পরিসংখ্যান মতে, প্রতিবছর ৫২ লাখ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নামছে স্বাস্থ্য খরচের বোঝার জন্য। এটা নিরসনে বাজেটে কোনো উদ্যোগ নেই।

 

অসচ্ছল যুদ্ধাহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারের বেশি নয়। তাঁদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সুশাসনের স্বার্থে এই বরাদ্দ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা যুক্তিসংগত পদক্ষেপ হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা, উৎসব ভাতা, নববর্ষ ভাতা, বিজয় দিবস ভাতা কি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন, না ঘুষ দিয়ে ভোট কেনার ব্যবস্থা, তা বিবেচনা প্রয়োজন। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন আর কৃষক-শ্রমিকরা দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ দৃঢ় করছেন। তাঁদের কথা অর্থমন্ত্রী ভুলে গেছেন। মোট ৬৫ বছরের বয়স্ক ব্যক্তিসংখ্যা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, দরিদ্র মাতা ও ল্যাকটেটিং মাতাদের কিছু অংশকে ভাতাদানের অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রের সরকারের নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির বিস্তার। ক্যান্সার, বিকল কিডনি, লিভার সিরোসিস ও স্ট্রোকের রোগীকে ১৫ হাজার টাকা অনুদান দালালের আয় বৃদ্ধি ছাড়া রোগীর চিকিৎসায় কিঞ্চিৎ লাভ হয় না। পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন।

 

আন্তর্জাতিক ইকোনমিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে ১৭৬ দিন লাগে, সে ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় প্রয়োজন হয় মাত্র ১৭ দিন। বাংলাদেশি আমলা মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষা ও কর্মদক্ষতায় দুর্বল নন, দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশে দুর্নীতির হার বৃদ্ধির অন্যতম পদ্ধতি। বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে অর্থ প্রেরণসংক্রান্ত রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, ৭.৮ মিলিয়ন বাংলাদেশি দেশে পাঠিয়েছে ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার, অন্যপক্ষে ছয় মিলিয়ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিলিপিনো শ্রমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও অধিক, সমসংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিক পাঠিয়েছেন ২০ মিলিয়ন ডলার। ১৬.৪ মিলিয়ন ভারতীয় শ্রমিক ভারতে অর্থ প্রেরণ করেছেন ৭০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে কর্মরত লক্ষাধিক ভারতীয় বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রেরণ করেছেন ৩.৭ বিলিয়ন ডলার।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত সামাল দিচ্ছেন রেডিমেড গার্মেন্টশিল্পের চার মিলিয়ন নারী শ্রমিক এবং ১০ মিলিয়ন অনধিক প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক। এদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ২২৭ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ৫৯৫ কোটি টাকা। অথচ এসব শ্রমিক আয় করেন বছর ৩০ বিলিয়ন ডলার।

 

কর সংস্কার সুপারিশ

 

কোনো বাজেট সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় এবং বাজেটে সবাইকে সন্তুষ্ট করা অসম্ভব ব্যাপার। কখনো কখনো কর্তৃপক্ষ ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ভুল কাজ করে। কর সংস্কার সুশাসনের অংশ।

 

১. ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকা হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আংশিক বা সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত সব ব্যক্তি, এমনকি ফুটপাতের দোকানদারও ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেবেন বছরে ন্যূনতম এক হাজার টাকা জমা দিয়ে। গৃহকর্মীদের ফি জমা দেবেন গৃহকর্মীর পক্ষে গৃহমালিক।

 

২. সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর হার কমানো ভুল কাজ হবে। এদের কর হার অবশ্যই ৪০ শতাংশ হওয়া উচিত। একইভাবে মোবাইল কল অপারেটর কম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

 

৩. দেশে ব্যবহৃত ফরমুলেটেড ওষুধের মূল্য সুলভ করার লক্ষ্যে সরকার ১৪১টি কাঁচামালের মধ্যে ৮১টির শুল্ক ৫ শতাংশ এবং বাকি ৬০টির শূন্য শুল্কহার ধার্য করেছে। ক্যান্সার ও বিকল কিডনি রোগের কিছু ওষুধের কাঁচামাল শূন্য শুল্ক আওতায় আনা হয়েছে। ১১টি কাঁচামাল ও সামগ্রীর শুল্ক ১০০ ও ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।

 

দুই-তিন হাজারের শুল্কের পরিবর্তে সব ওষুধের কাঁচামাল ও সামগ্রীর ওপর শূন্য শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে সব কাঁচামাল সামগ্রীর ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করলে শুল্ক অফিসে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে। এবং ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির মূল্য নির্ধারণ নিয়মাবলি প্রয়োগ করলে দেশের সব ওষুধের MRP মূল্য অর্ধেকে নেমে আসবে, ভোট সুবিধা হবে। অপরপক্ষে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি হবে।অপরপক্ষে ওষুধের কাঁচামাল শিল্পে  (Active Pharmaceutical Ingredient–API) বিনিয়োগ বেশি কিন্তু লাভ কম। দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনব্যবস্থা দৃঢ় না হলে বিদেশে বাংলাদেশের ওষুধের রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়বে।

 

৭. গার্মেন্টশিল্প লাভজনক শিল্প। বর্তমান বাজেটে ১৫ শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই শিল্পের কর হার ন্যূনতম ২০ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। লব্ধ অতিরিক্ত কর দিয়ে শ্রমিকের পূর্ণ স্বাস্থ্যসুবিধা ও সামরিক বাহিনীর দরে রেশনিং সুবিধা দিলে শ্রমিকের পুষ্টি বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে তাদের উৎপাদনশীলতা। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার কর্মীদের দুই-তিন অংশ মাত্র।

 

৮. গুঁড়া দুধের আমদানি শুল্ক না কমিয়ে দেশে গাভি ও ছাগি পালনের প্রণোদনা দিলে অধিকসংখ্যক দরিদ্র জনগণ উপকৃত হবে।

 

৯. প্রতি জেলায় ড্রাইভিং ও গাড়ি নিবন্ধন অফিস স্থাপন করে বর্তমানে প্রচলিত গাড়ির শ্রেণিবিন্যাস স্তর ২০ থেকে কমিয়ে ৯ স্তরে নামিয়ে আনলে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে। ৫ বা ১০ বছর নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করলে রেজিস্ট্রেশন বাবদ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয় হবে। বাস ও অ্যাম্বুল্যান্সকে জনস্বার্থে রোড ট্যাক্সের আওতাবহির্ভূত করা যুক্তিসংগত হবে। ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ পাঁচ বছরের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ১০ হাজার থেকে শুরু করে বাস-ট্রাকের জন্য এক লাখ টাকা। একবারে পাঁচ বছরের রোড ট্যাক্স হবে সমপরিমাণে। সামরিক বাহিনীসহ সব সরকারি যানবাহনকে নিবন্ধিত হয়ে নির্দিষ্ট হারে রেজিস্ট্রেশন ও রোড ট্যাক্সও দিতে হবে।

 

১০. গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি স্থানীয় গ্যারেজের কাছে স্থানান্তর হবে হয়রানি থেকে মুক্তির পথ। প্রতি দুই বছর পর পর গ্যারেজের মান নিয়ন্ত্রণ করবে জেলা ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ।

 

প্রতিবছর নতুন এক লাখ মোটরসাইকেল, অটোরিকশা প্রভৃতি এবং এক লাখ অন্যান্য গাড়ি রাস্তায় নামছে।

 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট ২০১৮-১৯

২৬ মে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ঢাকাসহ অন্য ১০টি জেলায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুুচ্ছেদের আলোকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণে’ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রায় তিন গুণ বড় ১২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট ‘২০১৮-১৯’ প্রকাশ করেছে।

 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মূল বক্তব্য, ‘মুক্তবাজারের উন্নয়ন দর্শন আর্থ-সামাজিক বৈষম্যকে প্রকটতর করেছে, বাড়িয়েছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, দুর্বল-সবলের বৈষম্য এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য। পাশাপাশি বাড়ছে গুটিকয়েক সুপার ধনী। আইন-বিচার সরকার রাজনীতি বস্তুত রেন্ট সিকার ক্ষমতাবাজদের পক্ষে, দুঃশাসনের মাত্রাতিরিক্ততা সুশাসনকে কাগুজে বুলিতে পরিণত করেছে। এ ছাড়া মৌলবাদের অর্থনীতির ২০১৬ সালে নিট লাভ হয়েছে তিন হাজার ১৬২ কোটি টাকা।

 

 

 

লেখক : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *